করোনা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে অনেকেরই হিমশিম অবস্থা

করোনা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে অনেকেরই হিমশিম অবস্থা

দিনাজপুর প্রতিদিন স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

করোনা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে অনেকেরই হিমশিম অবস্থা

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু সেখানে শয্যা কম। সব সময় সব ওষুধ বিনা মূল্যে পাওয়াও যায় না। তবু রোগীরা যাচ্ছেন। শয্যা খালি নেই, এই নোটিশ দেখে রোগীকে নিয়ে ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানকার ব্যয় আকাশচুম্বী। করোনায় মা–বাবা ও স্ত্রীকে হারিয়েছেন, এমন এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ব্যয় মেটাতে তিনি জমি বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া অনেকে ঋণ করছেন। করোনাভাইরাসে মানুষ মরছে, পাশাপাশি পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ছে।

গত বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল মো. বাবুলের সঙ্গে। তিনি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তারকে নিয়ে এসেছেন। বাবুল বলেন, ‘যেদিন আসছি, বউয়ের শ্বাসে খুব রাগ (তীব্র শ্বাসকষ্ট) আছিল, এখন সহজ হয়া আসছে। থাকা-খাওয়া, কয়েকটা ওষুধ ফ্রি। তা–ও বাইরে থেকে ওষুধ কিনছি সাড়ে আট হাজার টাকার।’

ইয়াসমিন কবে ছাড়া পাবেন, বাবুল জানেন না। তিনি বালুর নৌকা চালান। চিকিৎসা শেষ করতে কত টাকা লাগবে, তা-ও বলতে পারছেন না।

একই হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বুধবার কথা হচ্ছিল মো. রুবেল আহমেদ মোল্লার সঙ্গে। বাবা আবুল হাশেম মোল্লাকে হাসপাতালে ভর্তির আগেই ছয়-সাত হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। এই খরচের একটা বিবরণ দেন রুবেল। তিনি বলেন, ‘আব্বার কষ্ট হইতাছিল। প্রথমে নিছি মিটফোর্ড। সেখান থেকে এক পরীক্ষার জন্য নিছি ক্লিনিকে। তারপর ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল। ওইখানে রাখে নাই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসছি, সিট নাই। বলছে ডিএনসিসি বা সোহরাওয়ার্দীতে নিতে।’

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট করোনার চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। ওই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সরকারি হাসপাতালে রোগীপ্রতি ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক লাখ টাকা। অবশ্য এই টাকার ১৫/২০ শতাংশ রোগীকে বহন করতে হচ্ছে। বাকিটা সরকার দিচ্ছে। চিকিৎসকেরাই বলছেন, অনেক পরিবারের জন্য ওই ১৫/২০ হাজার টাকার মতো ব্যয় করাটাও অনেক কঠিন।

করোনা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে অনেকেরই হিমশিম অবস্থা

বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয় আরও বেশি। রোগীর অবস্থা ভেদে ও হাসপাতাল ভেদে ব্যয় এক লাখ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে আরও বেশিও হয়।

রোগের চিকিৎসা কেন ব্যয়বহুল, জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, করোনায় আক্রান্ত জটিল রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেই তাঁকে রক্ত তরল করার ইনজেকশন দিতে হয়। এই একটা ইনজেকশনে দিনে প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ পড়ে যায়। অ্যান্টিভাইরাল যে ইনজেকশন রয়েছে, সেটাও ব্যয়বহুল। প্রতি ঘণ্টায় অক্সিজেনের খরচ আছে। কারও কারও আবার প্রদাহ (ইনফেকশন) দেখা দেয়। এর জন্য যে অ্যান্টিবায়োটিক, সেটিও দামি। হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা, সিপ্যাপ ও ভেন্টিলেশন খুবই ব্যয়বহুল। শরীরের ভেতর ঝড় শুরু হলে একটা ইনজেকশন দিতে হয়। সে ইনজেকশনের এক ডোজের দাম ৭০ হাজার টাকার মতো।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, চিকিৎসার মাঝপথে অনেক রোগীই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। খরচ কুলাতে পারেন না। তাঁরাও তখন কাগজে সরকারি হাসপাতালের কথা লিখে ছেড়ে দেন। রোগী ও চিকিৎসক—দুই পক্ষই জানে, তাঁদের যাত্রা অনিশ্চিত। তাঁরা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে আশ্রয় পান, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারলেন কি না, সেই খবর সব সময় রাখা সম্ভব হয় না। চিকিৎসকদের অনেকেই রোগী দেখতে গেলে যে ভিজিট নেন, সেটা কমিয়ে রাখেন বা নেন না। তবে চিকিৎসার মোট যে খরচ, সেখানে চিকিৎসকদের এই টাকাটুকু সামান্যই বলে তিনি জানান।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী? কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর চিকিৎসার জন্য কয়েকটি হাসপাতাল ঠিক করে দিয়েছিল। রোগীর সংখ্যা বাড়ার পর বেসরকারি হাসপাতালগুলোও চিকিৎসা দিতে শুরু করে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকল না। ফলে ব্যয়ের ব্যাপক তারতম্য দেখা দিল।

আহমেদুল কবীর অবশ্য বলছিলেন, স্বাস্থ্যবিমাটা চালু থাকলে এমন সমস্যায় মানুষকে পড়তে হতো না। সিঙ্গাপুর বা অস্ট্রেলিয়ায় স্বাস্থ্যবিমা থাকায় মানুষের চিকিৎসা পেতে সুবিধা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় প্রত্যেকের কাছ থেকে স্বাস্থ্যবিমা বাবদ টাকা কেটে রাখা হয়। ব্যক্তি জানতেও পারেন না। কিন্তু সেই টাকায় ভুক্তভোগী মানুষ চিকিৎসা পান। বাংলাদেশে সেই ব্যবস্থা এখনো নেই।

বাংলাদেশের মতো অবস্থা অনেকটা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও। দেশটিতে করোনার দুটি ঢেউয়ে বিপর্যস্ত দেশটিতে চিকিৎসা চালাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে হাজারো পরিবার। অনেকে এই বড় অঙ্কের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনলাইনভিত্তিক সহায়তা দানকারী কয়েকটি প্ল্যাটফর্মের দ্বারস্থ হচ্ছেন। দেশটিতে ভুক্তভোগীকে সহায়তা দিতে স্বাস্থ্যবিমা ও সরকারি সহায়তার বিকল্প হয়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট।

সূত্রঃ প্রথম আলো

Dinajpur Today

করোনা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে অনেকেরই হিমশিম অবস্থা

Leave a Reply

Your email address will not be published.