করোনাটা যদি যাইতো, তাইলে স্কুলটা খুলত

করোনাটা যদি যাইতো, তাইলে স্কুলটা খুলত

দিনাজপুর প্রতিদিন দিনাজপুরের খবর শিক্ষা ও প্রগতি

করোনাটা যদি যাইতো, তাইলে স্কুলটা খুলত

‘খালি শুনি স্কুল খুলবে, খুলবে, কিন্তু স্কুল তো আর খোলে না। পরীক্ষা না দিয়ে নতুন ক্লাসে উঠলাম। নতুন বই পাইলাম, কিন্তু নতুন ক্লাসে গিয়া তো আর ক্লাস করা হইলো না। আগে কামাই করতাম (স্কুল ফাকি দিতাম) এখন স্কুলে যেতে চাই। আর বাড়িতে ভালো লাগে না। ইশ! করোনাটা যদি যাইতো, তাহলে স্কুলটা খুলতো।’

এভাবেই দিনাজপুরের দুই ক্ষুদে শিক্ষার্থী নিজেদের কষ্টের কথাগুলো পরস্পরকে বলছিল। তাদের এখন একটাই বায়না, তারা স্কুলে যেতে চায়।

এই দুই শিক্ষার্থী হলো-সুরাইয়া (৮) ও মিনহাজুল (১০)। তারা দিনাজপুরের রামভদ্রপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সুমাইয়ার বাবা একজন গাড়িচালক। আর মিনহাজুলের বাবা ট্রাক্টরচালক।

একটি গ্রামীণ পাকা সড়কের পাশে বসে শিক্ষার্থী মিনহাজুল তার সহপাঠীকে বলছিল, ‘রোজার ঈদের পর স্কুল খোলার কথা বলছিল স্যার। কিন্তু এখন তো ছুটি বাড়াল। হয়তো কোরবানির ঈদের আগে আর স্কুল খুলবে না। শুনলাম স্কুলের বড় ভাইয়ারা স্কুল খোলার জন্য আন্দোলন করবে। আমিও সেই আন্দোলনে যেতে চাই। তুই কি যাবি সুরাইয়া?’

উত্তরে সুরাইয়া বলল- ‘হ্যাঁ আমিও যাব। কিন্তু আন্দোলন করে কি হবে ? করোনা তো পালায় না। স্কুল থেকে নতুন বই পাইছি, কিন্তু এখনো স্কুল খুলল না। পড়ালেখা ঠিক মতো হচ্ছে না মিনহাজুল ভাইয়া। কতোদিন স্কুলের বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা হয় না। বান্ধবীদের সঙ্গে স্কুল মাঠে খেলা হয় না আর। বাড়িতে আর ভালো লাগে না। স্কুলে টিফিনের সময়ে মজাদার খাবার খাইতাম, এখন আর সেটাও খাওয়া হচ্ছে না।’

এই দুই শিশুর বাবা পেশায় চালক হলেও তাদের গ্রামে কিছু জমি রয়েছে। সেই জমিতে আমন ধানের বীজ রোপণ করেছে। সেই বীজ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পড়েছে শিশু দুটির ওপর। জমির পাশে বসে খেলাধুলার পাশাপাশি পড়ালেখা নিয়ে আলাপ করতে দেখা যায় তাদের। তাদের দুজনের হাতে ছিল দুটো হাঁস। অবশ্য সেই হাঁসগুলো তাদের না। তাদের জমির বীজ খেতে এসেছিল হাঁসগুলো। তাই তারা সেটি ধরে রেখেছে প্রকৃত মালিককে ফেরত দেবে বলে।

সুরাইয়া ও মিনহাজুলের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। এ সময় তারা খুব দ্রুতই খুনসুটিতে মেতে ওঠে প্রতিবেদকের সঙ্গে। পাল্টা তার প্রতিবেদককে জিজ্ঞেস করে, ‘আমাদের ছবি আর এগুলো লিখে কি করবেন? আপনি কি সাংবাদিক? পেপারে দেবেন আমাদের ছবি?’

তারা জানায়, সকাল ১০টা থেকে দুই ঘণ্টা ধরে বসে জমির বীজ দেখাশোনা করছে। দুপুর পর্যন্ত থাকবে, আবার দুপুরে খেয়ে বিকেলে আসবে বীজতলা পাহারা দিতে। এ সময় স্কুল খোলা থাকলে তারা স্কুলে থাকত। কিন্তু করোনার কারণে স্কুল বন্ধ।

এই শিক্ষার্থীরা আরও জানায়, করোনার কারণে এখন প্রতি শনিবার স্কুলে যায় তারা। সেখানে তাদের প্রশ্নপত্র দেয়া হয়। তারা সেটি বাড়িতে এনে উত্তর লিখে আবার স্কুলে জমা দেয়। সেখানে হয়তো দুই একজন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কথা হয়।

চলে আসার সময় তারা বলে, ‘আমাদের জন্য ভালো করে লিখিয়েন, আমাদের ছবি দিয়েন। বাবাকে বলব ছবি বের হইছে। পেপার কিনে আনতে। স্কুল খুললে সেই পেপার আমরা আমাদের বন্ধুদের দেখাব। বলব দেখ, আমাদের গল্প পেপারে ছাপাইছে।’

করোনাটা যদি যাইতো, তাইলে স্কুলটা খুলত

Dinajpur Today

Leave a Reply

Your email address will not be published.