কান্তজীর মন্দির

দিনাজপুরের প্রাচীন নিদর্শন স্থান কান্তজীর মন্দির

দিনাজপুর প্রতিদিন ভ্রমণ ও দর্শনীয় স্থান

দিনাজপুরের প্রাচীন নিদর্শন স্থান কান্তজীর মন্দির

১৬৮২ খ্রিষ্টাব্দ। দিল্লির সিংহাসনে তখন মুঘল বাদশাহ আওরঙ্গজেবের শাসন চলছিল। এ সময় দিনাজপুরের জমিদারি বেশ খারাপ সময় পার করছিল। পর পর দুই বড় ভাইয়ের অকাল মৃত্যুতে জমিদারির সিংহাসনে বসেন জমিদার প্রাণনাথ রায়। প্রাণনাথ রায় ছিলেন সবথেকে ছোট ভাই। জমিদার হিসেবে প্রাণনাথ রায় ছিলেন বেশ প্রজাদরদী। কথিত আছে সে সময় প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করতে প্রায় ৩০,০০০ টাকা ব্যয়ে তিনি খনন করেছিলেন রামসাগর দীঘি।

সিংহাসনে আরোহণের কয়েক বছর পর তাকে একটা বড় ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়। সে সময় ঘোড়াঘাট অঞ্চলে জমিদারি ছিল রাজা রাঘবেন্দ্র রায়ের। পারিরিবারিকভাবেই দিনাজপুর ও ঘোড়াঘাটের জমিদারির মধ্যে একটা শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব ছিল। আর প্রাণনাথ সবে দুই ভাইয়ের ক্ষমতার পালাবদলের পর জমিদারি হতে নিয়েছেন, তাই রাঘবেন্দ্র রায়ের কাছে এটি বেশ ভালো সুযোগ ছিল। তিনি দিল্লির বাদশার কাছে চিঠি লিখে বসলেন। যার মর্মার্থ ছিল প্রাণনাথ পারিবারিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পর পর তার বড় দুই ভাই রামদেব ও জয়দেব কে হত্যা করে এবং সিংহাসন দখল করে। উপরন্তু তিনি একজন অত্যাচারী এবং প্রজাশোষি জমিদার। সবথেকে গুরুতর অভিযোগ ছিল তিনি মুঘল দরবারে নিয়মিত খাজনা পাঠান না এবং দিল্লির অধীশ্বর বাদশার প্রতি অনুগত নন।

রাঘবেন্দ্র রায়ের এই ষড়যন্ত্র কাজে দিল। বাদশাহ আওরঙ্গজেব সমন জারি করলেন প্রাণনাথকে কৈফিয়ত দেওয়ার জন্য। অগত্যা প্রাণনাথকে ছুটতে হলো হাজার মাইল দূরে দিল্লির পথে। যাওয়ার সময় তিনি তার সাথে দিনাজপুরের বিখ্যাত সুগন্ধি কাটারিভোগ চাল ও বহুমূল্য উপহার নিয়ে যান মুঘল বাদশাহর উপঢৌকন হিসেবে।

প্রাণনাথের নম্র-ভদ্র আচরণ ও বহুমূল্য উপহার পেয়ে বাদশাহ আওরঙ্গজেবের ভুল ভাঙে। তিনি তাকে অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি দেন এবং মুঘল বাদশাহর প্রতি তার ভালোবাসা ও আনুগত্যে খুশি হয়ে আওরঙ্গজেব তাকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেইসাথে তাকে পুনরায় সফলতার সাথে জমিদারি পরিচালনার আদেশ দেন।

বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে প্রাণনাথ স্থির করেন তিনি ধর্মের জন্য একটা বড়সর কিছু করবেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন বড় কৃষ্ণভক্ত। তাই রাজা উপাধি পাওয়ার পর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তিনি নিজভূমে ফিরে আসার পূর্বে বৃন্দাবন ভ্রমণের জন্য মনস্থির করলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন ফিরে গিয়ে তিনি ভগবান কৃষ্ণের একটি মন্দির নির্মাণ করবেন। তবে এখানে বলে রাখি, একটা মিথ বলে যে মুঘল বাদশাহ আওরঙ্গজেব স্বয়ং তাকে একটি কৃষ্ণমন্দির নির্মাণের আদেশ দেন।

দিল্লি থেকে প্রাণনাথ চলে যান বৃন্দাবন। সেখানে তিনি কিছুদিন অবস্থান করেন এবং একটি কৃষ্ণমূর্তি তাকে বিমোহিত করে। তিনি সেই কৃষ্ণমূর্তি সঙ্গে করে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলে একরাতে স্বপ্নে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তাকে এই মূর্তি নিয়ে যেতে নিষেধ করেন এবং বলেন এতে তার ভক্তরা ব্যথিত হবে। তবে যেহেতু প্রাণনাথ কৃষ্ণভক্ত ছিলেন তাই ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তাকেও খুশি করার জন্য কথা দেন যে তিনি অবশ্যই তার সাথে যাবেন তবে এই মূর্তিতে নয় এই মূর্তির মতো দেখতে আরেকটা মূর্তিতে যা তিনি পরবর্তী দিনে স্নানের সময় লাভ করবেন।

স্বপ্ন অনুসারে তিনি পরবর্তী দিন স্নানের সময় একটি কৃষ্ণমূর্তি লাভ করেন যা অবিকল ওই মূর্তির মতো দেখতে ছিল। তবে আরেকটা মিথ হলো প্রাণনাথ নৌবহরে আসার সময় তার বহর এক জায়গায় থেমে যায় এবং তিনি একটি কৃষ্ণমূর্তি পান। এরপর ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তার স্বপ্নে আসেন এবং এই মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। প্রকৃতপক্ষে এসব গল্পের ঐতিহাসিক কোনো দলিল নেই, পুরো বিষয়টাকে পৌরাণিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সহজ হবে।

দিনাজপুর ফিরে প্রাণনাথ এই মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। মন্দির নির্মাণের জন্য তিনি শ্যামগর এলাকে বেছে নেন। এটি সেই শ্যামগর যার কথা মহাভারতে উল্লেখ আছে। তিনি ঢেপা নদীর তীরে একটি অস্থায়ী মন্দির নির্মাণ করেন। ভগবান কৃষ্ণের নামানুসারে শ্যামগড়ের নাম বদলে হয় কান্তনগর। অস্থায়ী সেই মন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয় সেই কৃষ্ণমূর্তির। এই অস্থায়ী মন্দিরটি এখনো কান্তজীর মন্দিরের অদূরে ভগ্ন অবস্থায় দাড়িয়ে আছে।

প্রাণনাথ এবার একটি বড় মন্দির নির্মাণের দিকে মনোযোগ দেন এবং পোড়ামাটির ফলক দ্বারা মন্দিরের সম্পূর্ণ গাত্র অলংকরণের সিদ্ধান্ত নেন।১৭০৪ সালে শুরু হয় মূল মন্দির নির্মাণের কাজ। উচু বেদির উপর কারিগরদের অসামান্য দক্ষতায় চলতে থাকে মন্দির নির্মাণের কাজ। একসময় জীবনের সায়ান্নে চলে আসেন প্রাণনাথ রায়। ১৭২২ সালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তাই পোষ্য পুত্র রামনাথ রায় সিংহাসনে বসেন। সিংহাসনে বসার পর বাবার শেষ ইচ্ছা অনুসারে তিনি মন্দির নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিতে থাকেন। ১৭৫২ সালে মন্দিরটির নির্মাণকাজ শেষ হয়।

নির্মাণকৃত মন্দিরে মোট নয়টি চুড়া থাকার কারণে একে অনেকেই নবরত্ন মন্দির নামে ডাকেন। ১৮৯৭ সালে মন্দিরটি বেশ বড় ভূমিকম্পের কবলে পড়ে এবং এর চুড়াগুলো ভেঙে যায়। সে সময়ের জমিদার মহারাজ গিরিজানাথ মন্দিরটির ব্যাপক সংস্কার করলেও শেষপর্যন্ত চূড়াগুলো সংস্কার করা সম্ভব হয়নি।

১৯৬০ সালে সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিভাগ এই মন্দিরকে প্রাচীন কীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে এবং এর সংস্কারের দায়িত্ব নেয়। সেই থেকেই এই পুরাকীর্তি প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ কতৃক সংরক্ষিত হয়ে আসছে। তবে এখানে বলে নেওয়া ভালো প্রাণনাথ রায়ের আনা কৃষ্ণমূর্তিটি কিন্তু এখন আর নেই। এক রাসযাত্রার সময় মূর্তিটি চুরি হয়ে যায়। অনেকের মতে ভূমিকম্পের সময়েই চুরি যায় মূর্তিটি।

মোটাদাগে এই ছিল কান্তজীর মন্দির নির্মাণের ইতিহাস। এবার একটু এই মন্দিরের বিশেষত্বের দিকে নজর দেওয়া যাক।

এই মন্দির বিখ্যাত মূলত এর অভাবনীয় নির্মাণশৈলীর কারণে। নির্মাণকালে মন্দিরটির চূড়ার উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। তিনতলায় নির্মিত এই মন্দিরের গঠনশৈলী স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন। তবে এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো সারাদেহে বসানো পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটার অনিন্দ্যসুন্দর কারুকার্য। প্রায় ১৫০০০ এর মতো টেরাকোটার ফলকসমৃদ্ধ এই মন্দির ছিল অবিভক্ত বাংলার সবথেকে সুন্দর মন্দির। শুধু তাই নয় অবিভক্ত ভারতের এগারতম আশ্চর্য ছিল এটি।

এর গায়ে লাগানো পোড়ামাটির ফলক বেশ উৎকৃষ্ট মনের যা সমসাময়িক কোনো দালানে দেখা যায় না। তবে পোড়ামাটির ফলকগুলোর বিশেষত্ব আসলে অন্যখানে। এগুলো সাধারণ কোনো টেরাকোটার কাজ নয়। এর গায়ে লাগানো প্রত্যেকটা ফলকে রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তবে কিছু ফলকে মুঘল আমলের চিত্রবর্ণনাও দেখা যায়। তবে এসব ফলকের উপস্থাপন ছিল অনন্য যা অন্যান্য টেরাকোটার নিদর্শনে দেখা যায় না। এর স্তম্ভের কার্নিশে সমসায়িক জীবন ও অভিজাত শ্রেণির শিকারের দৃশ্য চিত্রায়িত হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে মুঘল জীবন ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। মুঘল বাদশাদের শিকার ও কারুকার্য খচিত রথের দৃশ্যায়ন দেখা যায় এ ধাপে। তৃতীয় ধাপে রয়েছে পৌরাণিক কাহিনী বিবরণ। রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনী বর্ণিত আছে এই অংশে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, সীতার বনবাস, বাকাসুর হত্যা ইত্যাদি গুরুত্তপূর্ণ পৌরাণিক কাহিনী স্থান পেয়েছে এই ধাপে। তবে এই ধাপের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লৌকিক উপস্থাপন। শ্রীকৃষ্ণের কাহিনী সমূহকে এখানে জনসাধারণের জীবনের মতো চিত্রায়িত করা হয়েছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পৌরাণিক গল্পকথা। পৌরাণিক কাহিনীর লৌকিক উপস্থাপনে তাই কারিগরদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতার এক অনন্য নিদর্শন এই ফলকগুলো।

কেন যাবেন কান্তজীর মন্দির 

ঢেপা নদীর তীরের কান্তজীর মন্দির টেরাকোটার স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। এই মন্দিরে ব্যবহৃত এত উৎকৃষ্ট টেরাকোটার ফলক আপনি দেশের আর কোথাও দেখতে পাবেন না। কান্তজীর মন্দিরের বিখ্যাত রাসমেলা দেখতেও চলে যেতে পারেন উত্তরবঙ্গের সবথেকে প্রাচীন জেলা দিনাজপুরে। কান্তনগরের শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ যেকোনো ভ্রমণপিপাসুর কাছে নিঃসন্দেহে আকর্ষণের। আর হ্যাঁ কান্তজীর মন্দির ভ্রমণের বোনাস হিসেবে দেখতে পাবেন ঐতিহাসিক নয়াবাদ মসজিদও। একটু জানিয়ে রাখি কান্তজীর মন্দির নির্মাণের জন্য ভারত থেকে আগত মুসলমান স্থপতিরা নিজেদের জন্য এই মসজিদ নির্মাণ করেন। এখানেও মধ্যযুগীয় নির্মাণশৈলীর দেখা পাওয়া যায়।

ট্যুর গাইড

দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে কাহারোল উপজেলায় কান্তজীর মন্দির এর  অবস্থান। ঢাকা থেকে বাস ও ট্রেনে সরাসরি দিনাজপুর চলে যেতে পারেন। এরপর ইজিবাইকে করে বারোমাইল নামক স্থানে নেমে এক কিলোমিটারের হাটা পথ পাড়ি দিলেই পৌঁছে যাবেন শান্ত ও স্নিগ্ধ প্রকৃতির কান্তনগর গ্রামে। অবশ্য বারোমাইল থেকে ভ্যানেও যেতে পারেন।

কান্তজীর দর্শন শেষ হলে অদূরে অবস্থিত নয়াবাদ মসজিদটি দেখতে ভুলে যাবেন না। ছোট্ট সুন্দর এই মসজিদের প্রাকৃতিক পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। আর কান্তজীর মন্দিরের সাথে বোনাস হিসেবে ঘুরে আসতে পারেন দিনাজপুরের আরো কিছু বিখ্যাত স্থান যেমন: রামসাগর, সুখসাগর, দিনাজপুর রাজবাড়ী ও শিংরা ফরেস্ট। উত্তরবঙ্গের সবথেকে প্রাচীন এই জেলা আপনাকে একটা অসাধারণ ট্যুর উপহার দেবে নিঃসন্দেহে।

এছাড়াও গ্রীষ্মকালের ভ্রমণে বোনাস হিসেবে পাবেন দিনাজপুরের রসালো লিচু। যদিও হরেক রকমের পিঠাপুলির কারণে উত্তরের এই জনপদ শীতের মৌসুমেই সবথেকে বেশি জেগে ওঠে। তবে শীতের মৌসুমে গেলে অবশ্যই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন। উত্তরের হাড় কাপানো শীতে আপনার দিনাজপুর ভ্রমণ শুভ হোক।

Dinajpur Today Facebook Page and Group

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *