দিনাজপুরে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, বাড়ছে করোনার সংক্রমণ

দিনাজপুরে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, বাড়ছে করোনার সংক্রমণ

দিনাজপুর প্রতিদিন দিনাজপুরের খবর স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

দিনাজপুরে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, বাড়ছে করোনার সংক্রমণ

দিনাজপুরে করোনা সংক্রমণের হার বাড়তে শুরু করেছে। হাসপাতাল, জনবহুল স্থান, হাটবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মানুষের মধ্যে সচেতনতার ব্যাপক অভাব রয়েছে। এসব কারণে গত তিন মাসে জেলায় করোনা শনাক্তের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরে গত বছরের ১৪ এপ্রিল প্রথম এক ব্যক্তির শরীরে করোনা শনাক্ত হয়। বছর শেষে করোনার সংক্রমণ বেড়েছে। এরপর কমতে থাকলেও চলতি বছরের মার্চে বাড়তে শুরু করে। মার্চে জেলায় করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৪৬। এপ্রিলে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৬৯। মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১৩। করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যার সঙ্গে এ রোগে মারা যাওয়া ব্যক্তির সংখ্যাও বাড়ছে। গত আট মাসের হিসাব বিবেচনায় মে মাসে মৃত্যুর হার বেশি। এ মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে শনাক্তের হার ছিল ১৭ শতাংশ। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে চলতি মাসে টানা তৃতীয় দিন শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে। আক্রান্ত বিবেচনায় দিনাজপুরে সুস্থতার হারও কমছে। হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় সুস্থতার হার ৯২ শতাংশ। তবে গত পাঁচ মাসে সুস্থতার হার ৯৫-৯৭ শতাংশের মধ্যে ছিল। চলতি মাসে গতকাল পর্যন্ত হাসপাতাল ও হোম আইসোলেশনে থাকা রোগীর সংখ্যা ২৯২। গত মার্চে হাসপাতালে ১০৩ জন, এপ্রিলে ২৮৭ জন ও মে মাসে ২২৪ করোনা রোগী চিকিৎসাধীন ছিল।

করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরে করোনা রোগীদের জন্য জেলার সরকারি–বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ২৬৬টি শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল হাসপাতালে ৭৬টি, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৩০টি, কাহারোল উপজেলায় ২৫টি, বিরলে ২৫টি, পার্বতীপুর ল্যাম্প হাসপাতালে ১০টি এবং ১০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০টি করে মোট ১০০টি শয্যা রয়েছে।
গত কয়েক দিনে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল, বিরল ও কাহারোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা যায়, শুধু এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের ভিড়। এখানে করোনা রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ১৫টি শয্যা রয়েছে। এ ছাড়া রেড জোন, ব্লু জোন এবং এইচডিইউ জোনে ৬১টি শয্যা রয়েছে।

গতকাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিট ঘুরে দেখা যায়, শুধু এসডিইউ ও সাধারণ কর্ণারে ১২টি শয্যা ফাঁকা আছে। করোনা ইউনিটের সামনে রোগীদের স্বজনদের জটলা। রোগীর স্বজনেরা ইচ্ছামতো ওই ইউনিট থেকে বের হচ্ছেন। হাসপাতালের প্রধান ফটক, বিভিন্ন ওয়ার্ড, ওয়েটিং রুমসহ বিভিন্ন স্থানে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা হয়নি। এসব স্থানে কেউ সামাজিক দূরত্বও মানছেন না।
হাসপাতালের ওই ইউনিটে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ড বয় ও নার্সরা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বাইরে বের হচ্ছেন। রেড জোনে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নেই কোনো ব্যবস্থা। শুধু তা–ই নয়, হাসপাতালের বাইরে যাঁরা করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে আসছেন, তাঁরাও স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না।

গতকাল বেলা ১১টার দিকে মেডিকেল কলেজের রেড জোন থেকে বের হন জুলফিকার আলী(৫০)। বোনের স্বামীকে করোনা ইউনিটে ভর্তি করেছেন তিনি। রোগীর কাছ থেকে বাইরে আসছেন এবং সবার সঙ্গে মিশছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্যারাসিটামল ছাড়া কোনো ওষুধ পাই নাই। বিভিন্ন টেস্ট দিয়েছে, বাইরে থেকে করা লাগছে। এসব কাজ কে করবে।’

সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে , জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১ হাজার ৩৫২টি অক্সিজেন সিলিন্ডার, ১৯টি হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা, ৫টি ভেন্টিলেটর ও ৩৮টি অক্সিজেন কনসানট্রেটর আছে। এর মধ্যে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৯৫০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে।

সদর, কাহারোল ও বিরল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, এসব হাসপাতালের কক্ষের দরজায় লিখে রাখা হয়েছে, ‘করোনা ইউনিট’। কিন্তু ভেতরে জমে আছে ধুলাবালু ও ময়লা। কোনো শয্যা প্রস্তুত নেই। করোনা সংক্রমণের শুরুতে কাহারোল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৮ রোগী প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। এখানে দু-একটি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ও কয়েকটি সিলিন্ডার ছাড়া জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কোনো সরঞ্জাম নেই। শুধু তা–ই নয়, কাহারোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও নেই।

জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্যসচিব ও সিভিল সার্জন মো. আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা জটিল না হলে হাসপাতালে কেউ ভর্তি হতে চান না। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ব্যক্তিদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার। যাঁরা বাড়িতে হোম আইসোলেশনে আছেন, তাঁদের মুঠোফোনে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।’

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা চিকিৎসার কোনো প্রস্তুতি নেই, এমনকি শষ্যাগুলো প্রস্তুত নেই কেন জানতে চাইলে সিভিল সার্জন মো. আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘গত কয়েক মাসে করোনা সংক্রমণের মাত্রা কমে গিয়েছিল। রোগীর সংখ্যা কম ছিল। তবে আক্রান্ত রোগীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে আমরা সাধারণত মেডিকেলে আনার ব্যবস্থা করে থাকি।’

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ জাকি বলেন, গত কয়েক দিনে করোনার সংক্রমণ বেড়েছে। মানুষকে স্বাস্থ্যসচেতন করতে প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম চলমান। তিনি আরও বলেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি এমন থাকলে দু–এক দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সদর উপজেলার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দিনাজপুর জেলায় শনাক্তের ৫৬ শতাংশই সদর উপজেলার

জেলায় সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমণ সদর উপজেলায়। গতকাল পর্যন্ত এ জেলায় ৫ হাজার ৯২৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৩৮ জনই সদর উপজেলার। এ হিসাবে মোট শনাক্তের ৫৬ শতাংশই সদর উপজেলার। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত হওয়া ৩২ জনের মধ্যে ২৫ জনই সদর উপজেলার। জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, গত তিন মাসে সদর উপজেলায় ৬ হাজার ৫২৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তার মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৮৪ জন। এ ছাড়া জেলায় এ পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন ১৩১ জন, যার ৬৩ জন এ উপজেলার।

দিনাজপুরে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, বাড়ছে করোনার সংক্রমণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *