নয়াবাদ মসজিদ

ইতিহাসের সাক্ষী দিনাজপুর জেলার নয়াবাদ মসজিদ 

দিনাজপুর প্রতিদিন ভ্রমণ ও দর্শনীয় স্থান
ইতিহাসের সাক্ষী নয়াবাদ মসজিদ দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের নয়াবাদ মিস্ত্রিপাড়া গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই নয়াবাদ মসজিদ। 

দিনাজপুর (কাহারোল): আজ থেকে প্রায় তিনশ’ বছর আগে ১৭২২ সালে তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা প্রাণনাথ বর্তমান কাহারোল উপজেলার কান্তনগর গ্রামে একটি মন্দির নির্মাণের জন্য মধ্যপ্রাচ্য (খুব সম্ভবত মিসর) থেকে একদল কারিগর আনেন।

কারিগরদের সবাই মুসলমান ও ধর্মপ্রিয়। মন্দির নির্মাণ কাজে এসেও ভুলেনি নিজ ধর্ম পালন করতে।

নির্মাণকালীন সময় মন্দিরের পাশেই খোলা আকাশের নিচে নামাজ আদায় করতেন তারা। এরই মধ্যে কারিগরদের প্রধান (হেডমিস্ত্রি) নেয়াজ অরফে কালুয়া মিস্ত্রি মহারাজার দরবারে গিয়ে সব মিস্ত্রিদের থাকা ও ধর্ম পালনের নিমিত্তে একটি মসজিদ নির্মাণের জায়গা চান।

এ সময় মহারাজা মন্দির থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বে ঢেপা নদীর পশ্চিম কোল ঘেষে অবস্থিত নয়াবাদ গ্রামে ১ দশমিক ১৫ বিঘা জমি মসজিদ নির্মাণের জন্য জায়গা দেন। এ ছাড়া মসজিদের পাশে থাকার বাড়ি করার নির্দেশ দেন মহারাজা।

মহারাজার নির্দেশ মোতাবেক মিস্ত্রিরা মন্দিরের পাশাপাশি নয়াবাদ গ্রামে নিজেদের থাকার বাড়ি ও নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদ নির্মাণ কাজ চালিয়ে যায়। নয়াবাদ মসজিদ নির্মাণের পর তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন সেখানে।

এক পর্যায়ে মহারাজা প্রাণনাথের মৃত্যুর পর তারই দত্তক ছেলে মহারাজা রামনাথের আমলে ১৭১৫ সালে মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এরই মধ্যে মন্দিরের পাশাপাশি মসজিদের কাজও শেষ করে মিস্ত্রিরা। মন্দির নির্মাণ কাজে কালুয়া মিস্ত্রির নেতৃত্বে আসা মিস্ত্রিরা মন্দির নির্মাণের কাজ শেষে ফিরে যায় নিজ দেশে। কিন্তু এদেশ ছেড়ে যেতে চায়না নেয়াজ ওরফে কালুয়া মিস্ত্রি ও তার ছোট ভাই।

আবার নেয়াজ মিস্ত্রি মহারাজার দরবারে হাজির হয়। এবার স্থায়ীভাবে বসবাস ও জীবিকা নির্বাহের জন্য মহারাজার কাছে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু জমির আবদার করেন। তাৎক্ষনিক মহারাজা কিছু জমি তাদের দুই ভাইকে দান করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মিসরীয় এই দুই ভাই মহারাজার দানকৃত জমিতে ফসল আবাদ করে দিনাতিপাত করেন।

মৃত্যুর পর কালুয়া মিস্ত্রি ও তার ছোট ভাইকে নয়াবাদ মসজিদ সংলগ্ন দাফন করা হয়। এই মিস্ত্রিদের নামনুসারে অত্র এলাকার নাম হয় নয়াবাদ মিস্ত্রিপাড়া। বর্তমানে মন্দির ও মসজিদ নির্মাণের হেড মিস্ত্রি ও তার ছোট ভাইয়ের বংশধররা নয়াবাদ মিস্ত্রিপাড়ায় বসবাস করছে।

দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের নয়াবাদ মিস্ত্রিপাড়া গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই নয়াবাদ মসজিদ।

জেলা শহরের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম কোণে ঢেপা নদীর পশ্চিম কোলঘেঁষে অবস্থিত মসজিদটি ১ দশমিক ১৫ বিঘা জমির প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে চলছে উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ।

উত্তর-দক্ষিণে মসজিদটিতে একটি করে জানালা রয়েছে। দরজা-জানলার খিলান একাধিক খাঁজযুক্ত। যার ভেতরে পশ্চিমাংশে আছে তিনটি মেহরাব। মাঝের মেহরাবের তুলনায় দু’পাশেরগুলো একটু ছোট। মাঝের মেহরাবের উচ্চতা ২ দশমিক ৩০ মিটার ও প্রস্থ ১ দশমিক ৮ মিটার। মসজিদজুড়ে আয়তাকার বহু পোড়ামাটির ফলক রয়েছে। পোড়ামাটির নকশাগুলো বহু জায়গায় খুলে পড়েছে। ফলকগুলোর আয়তন দশমিক ৪০ মিটার দশমিক ৩০ মিটার। ফলকগুলোর মধ্যে লতাপাতা ও ফুলের নকশা রয়েছে। এরূপ মোট ১০৪টি আয়তাকার ফলক রয়েছে। তবে ফলকের মধ্যে অলংকরণের অনেকটাই প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত।

নয়াবাদ মসজিদ আয়তাকার মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট। এর চারকোণায় রয়েছে চারটি অষ্টভূজাকৃতির টাওয়ার। বাইরের দিক থেকে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ৪৫ মিটার ও প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটার। দেয়ালের প্রশস্ততা ১ দশমিক ১০ মিটার। মসজিদে প্রবেশের জন্য পূর্বদিকে রয়েছে তিনটি খিলান। মাঝের খিলানের উচ্চতা ১ দশমিক ৯৫ মিটার, প্রস্থ ১ দশমিক ১৫ মিটার। পাশের খিলানদ্বয় সমমাপের এবং অপেক্ষাকৃত ছোট।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নয়াবাদ মসজিদের অনেক অংশ সংস্কার করে চারপাশ ঘিরে দেয়াল দিয়েছে। মসজিদ এলাকায় পর্যটকদের জন্য করা হয়েছে চলাচল ও বসার ব্যবস্থা। সংযোগ দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ লাইন, স্থাপন করা হয়েছে সোলারও।
নেয়াজ অরফে কালুয়া মিস্ত্রির বংশধর ও নয়াবাদ মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুল মান্নান বাংলানিউজকে জানান, নয়াবাদ মসজিদ অত্র এলাকা ও আশপাশের সবচেয়ে প্রাচীনতম। প্রাচীন সব ইতিহাসের স্মৃতি বহনকারী নয়াবাদ মসজিদ এখন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বেশ পরিচিতি পেয়েছে দেশজুড়ে। বছরজুড়ে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক দেখতে ও জানতে আসেন মসজিদের প্রাচীন ইতিহাস। বর্তমানে পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোড়দার করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক রয়েছে পুলিশের টহল দল।

যাতায়াত: কান্তজিউ মন্দির সংলগ্ন নয়াবাদ মসজিদ অবস্থিত। এখানে যাতায়াত করা খুবই সহজ, রাজধানী ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন ও প্লেনযোগে যাতায়াত করা যায়।

থাকা ও খাওয়া: মসজিদ সংলগ্ন কান্ত নগর এলাকায় একটি সরকারি রেস্ট হাউজ ও পর্যটন মোটেলের একটি শাখা রয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক হোটেলগুলোতে থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। আর খাবারের জন্য মসজিদ এলাকার আশপাশে ছোট-বড় বিভিন্ন মানের হোটেল গড়ে উঠেছে।

Dinajpur Today Facebook Page and Group

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *